Categories
বিবিধ

প্রোগ্রামিং…মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

জামশেদ আজ কাজের ছেলেটাকে বেদম পিটাল… কারণ কি?? কারণ হচ্ছে কাজের ছেলেটা তার আপার সোনার বালা চুরির দায়ে অপরাধী… অপরাধী হিসেবে তার সাজাটা তো পাওয়া ছিলই। জামশেদ ঢাকার মহাখালী এলাকায় একটা ছোট্ট ফ্লাটে থাকে। ফ্ল্যাট টি তার আপার। জামশেদ জীবনে তেমন কিছুই করেনি। দিনআনে দিনখায় অবস্থা। একটা কিন্ডারগার্টেন এ মাস্টারী করে। মাসিক খরচ বাদে তারকাছে সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা বাঁচে।
জামশেদ এর বাসার কিছু দূরে একটি নতুন কম্পিউটারের দোকান দিয়েছে। কম্পিউটার জিনিসটি দেখা তার বেজায় শখ। কিন্তু টাকার অভাবে তা দেখা হয় নি। একদিন সে তার বাচানো ২০০ টাকা নিয়ে সাহস করে দোকানে ঢুকে পড়ল। ঢুকেই তো তার চোখ ছানাবড়া.. কিসব জিনিস.. টিভির মত একটা বক্স.. হাত দিয়ে কিযেন কি করছে একটা লোক (মাউস) , আবার সামনে রাখা প্লাস্টিকের চওড়া একটা বাক্সমত কিযেন বারবার টিপাটিপি করছে…
জামশেদ সাহস করে ডাইরেক্টর সাহেব কে বলল আমি কম্পিউটার শিখতে চাই। কত টাকা লাগবে?? ১৫০০ টাকা কোর্স। জামশেদ বলল ঠিক আছে আমি রাজি আছি।
অপারেটর এর কাছ থেকে জামশেদ খুব দ্রুত সবকিছু শিখে নিল। মাউস, কিবোর্ড, মনিটর, সিপিইউ সবই মোটামুটি তার আয়ত্তে এসে গেল কয়েকদিনেই। কিছুদিন পরে অপারেটর ও জামশেদ এর টাইপিং স্পিড দেখে বিস্মিত না হয়ে পারল না। অপারেটর তাকে টাইপ করার অফার দিয়ে দিল। প্রতি ১০০ পৃষ্ঠা ১০ টাকা। এ থেকে জামশেদ এর মোটামুটি ভাল আয় হতে শুরু করল। প্রতিদিন ৫০ টাকা আয়। আস্তে আস্তে কম্পিউটারের কোন কিছুই শিখতে বাকি থাকল না। শুধু প্রোগ্রামিং বাদে। প্রোগ্রামিং শিখতে আরো টাকার প্রয়োজন। প্রায় ৫০০০ টাকার মত লাগবে। এবারও অদম্য আকর্ষণের জয় হল। জামশেদ কিছু না বুঝেই বলে দিল আমি রাজি। টাকা কিভাবে আসবে কখন আসবে তার কোন ধারণা তার ছিল না।
তো আস্তে আস্তে সে প্রোগ্রামিং এর দুনিয়ায় প্রবেশ করল। বরাবরের মতই এবারও সে খুব দ্রুত শিখতে লাগল। কাজের ফাকে ফাকে আবার টাইপিং করে টাকাও আয় করা শিখে গেল। আরও কিছুদিন পর যে অপারেটর শিখাত মোটামুটি তার সমান শিখে ফেলল। এর কিছুদিন পর যে অপারেটর শিখাত সে ভাল চাকরীর অফার পেয়ে চাকরী ছেড়ে দিল। আর জামশেদ এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাল। সে ডাইরেক্টর কে ধরে চাকরী টা বাগিয়ে নিল। এরপর থেকে অন্যান্যদের শিখাতে শিখাতে সেও আরও নতুন কিছু জিনিস নিজে আবিষ্কার করতে থাকল। মোটামুটি খেলাধুলা করার একটা গেমও বানিয়ে ফেলল।
কিন্তু একসময় জামশেদ এর টাকা পরিশোধ করার সময় এল। ৪০০০ টাকার মত বাকী ছিল। এরই মধ্যে সে তার জীবনের একটা জঘন্য কাজ করে ফেলল। কম্পিউটারের জন্য সে তার আপার সোনার বালা চুরি করল এবং তার দায় চাপাল কাজের ছেলেটার উপর। মারতে মারতে সামনের দুটি দাত পড়ে গেল। রক্ত আর দাঁত পড়া অবস্থায় ছেলেটির চেহারা সে কোনদিন ভুলতে পারবে না। ছেলেটি সেদিনই তার সব জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেল।
জামশেদ এখন একজন প্রোফেশনাল প্রোগ্রামার। যেকোন প্রোফেশনাল প্রোগ্রামারের চেয়ে নি:সন্দেহে সে অনেক বেশী কাজ জানে।
একদিন পেপারে একটা বড়সড় এড দেখতে পেল। একজন প্রোফেশনাল প্রোগ্রামার নিয়োগ করা হবে নামীদামী একটি কম্পিউটার কোম্পানীতে। কোম্পানীর নাম মাইক্রোসফট [© BILL GATES]। বেতন ৪৫ হাজার বা ৫০০০০ হাজারের কম নয়। জামশেদ কি বুঝল কে জানে! নিজেকে উপযোগী মনে করে একটা এপ্লাই করে দিল চাকরীর জন্য। তার বিস্ময়ের বাকি ছিল না যেদিন দেখল উপরে মাইক্রোসফট এর সিলমোহর করা একটা চিঠি তার নামে এসেছে। জয়েন করার ডেট ১ নভেম্বর।
জামশেদ এর জীবনে আমুল পরিবর্তন এসেছে। নিজের পার্সোনাল রুম। পার্সোনাল ল্যাপটপ। প্রোগ্রমিং শেখার দামী দামী সব বই। তার সামনে এখন একটা সুপার কম্পিউটার। কোম্পানীর ডাইরেক্টর কে জিজ্ঞাস করে সে এই জিনিস ব্যাবহার করার অনুমতি পেয়েছে। অভ্যাসবসত প্রতিদিন নাড়াচাড়া করতে করতে একটু একটু করে যেমন একটা বড় জিনিস তৈরী হয়..ঠিক তেমন করে জামশেদ একটা সফটওয়্যার বানিয়ে ফেলল। এই সফটওয়্যারে সে তার নিজের বাড়ি রয়েছে, তার নিজের রুম রয়েছে, নিজের রুমে কাপড়চোপড় ছড়িয়েছিটিয়ে রাখা, টেবিলের ওপর উল্টাপাল্টা ভাবে বই রাখা, জানালার কোণায় ঝাড়ু আছে, সে ছাড়াও তার আপা রয়েছে… রয়েছে একটা জানালা থেকে ঢাকার ব্যাস্ততাও দেখা যায়। এই ব্যাস্ততার মাঝেও জামশেদ সেই কাজের ছেলেটার কথা ভাবে। কোন অপরাধ না করেও ছেলেটাকে এমন শাস্তি পেতে হল! ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস!!!
একদিন কোম্পানীর ডাইরেক্টর সাহেব মুহাম্মদ ইকবাল কে সে প্রোগ্রামটি দেখাল। ডাইরেক্টর সাহেব বললেন.. এটা তুমি বানিয়েছ? –হ্যা। দেখি কি রকম। আমি হাটতে পারছি! –হ্যা আপনি পারবেন। আমি আমার দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করলাম। আরে বইও পড়া যায় নাকি! বই নিয়ে পাল্টা উল্টাতে লাগলেন ডাইরেক্টর সাহেব। তিনি বললেন ইউ আর এ জিনিয়াস!! তুমি এটি করতেও বাদ দেও নি!! না আমি বাদ দেই নি… ডাইরেক্টর সাহেব আমার ভার্চুয়াল রুমে ঘোরাঘুরি করতে থাকলেন… তারপর একে এক তার চোখে পড়ল আমার বিছানার পাশে রাখা ঝাড়ু, টেবিলের ড্রয়ারে রাখা কিছু জিনিসপত্রছাড়াও আরো নানা রকম জিনিস… একসময় তার চোখ উঠে গেল আমার ড্রইং রুমের উপরের দেওয়ালের দিকে… সেখানে ২-৩ টা গোবদা মাকড়সা ঘোরাঘুরি করছিল… ডাইরেক্টর সাহেব সেটা দেখে আৎকে উঠলেন… বললেন… “ফেলো.. ফেলো.. ঝেড়ে ফেল ওটা… এক্ষুনি!” জামশেদ পিসির কন্ট্রোল হাতে নিয়ে বিছানার পেছনের অংশ থেকে ঝাড়ু বের করে মাকড়সাগুলোকে বেদম পেটাতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবগুলা মাকড়সা পড়ে বইয়ের উপরে পড়ে ৮টা পা ভয়ংকর ভঙ্গিতে কিলবিল করতে থাকল… তখন কি হল জানি না… পুরো পিসিটা বাস্ট্ হয়ে গেল!
ডাইরেক্টর সাহেব বললেন তু..ত্তুমি এটা ক্কিভাবে করলে? এটা হচ্ছে সুপার কম্পিউটার.. এটার কোন সমস্যা এখনও পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয় নি। ওইদিন জামশেদ আপন মনে ভাবতে ভাবতে বাড়ীর পথ ধরল। তার মনে হচ্ছে পৃথিবীটাকেও কি একটা পোগ্রামিং? এটাও কি হতে পারে… ঠিক এই সময় তার সামনে বেঞ্চ এ সেই কাজের ছেলেটাকে দেখতে পেল। ময়লা দাত বের করে হাসছে! “ভাইজান ক্যামন আছেন? ভালা আছেন নি?” এই কথাগুলো শোনার পরই জামশেদ এর মনে হল সে একটা চরম ভুল করে ফেলেছে… এই ভুলের কোন সমাধান নেই… ভয়ে সে চোখ বন্ধ করে ফেলল… ৫ সেকেন্ড পরে যখন খুলল তখন রক্তাক্ত দেহ ছাড়া আর কিছুই তার নজরে পড়ল না…

পরিশেষ:
কি হে? আবার নতুন করে শুরু করবে নাকি? অজ্ঞাত এক কণ্ঠস্বর।
পাশের থেকে আরেকজন… নাহ অনেক হয়েছে!

বি.দ্র এটি মুহাম্মদ জাফর ইকবালের লেখা একটা বইয়ের একটি ছোটগল্প।

By সাইফ দি বস ৭

পুরো নাম সাইফ হাসান। ছোটকাল থেকেই প্রযুক্তি, কম্পিউটার সম্পর্কিত বিষয়ে প্রচুর আগ্রহ এবং কৌতূহল। বর্তমানে কর্মরত আছেন উইডেভসের প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে। হিউম্যান সেন্টার্ড ডিজাইন, প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট এবং এজাইল প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টেই ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করেন।

One reply on “প্রোগ্রামিং…মুহাম্মদ জাফর ইকবাল”

Leave a Reply to অরীত্র আহমেদ Cancel reply