Categories
আমার যত কথা

আইনস্টাইন ভ্রান্ত!

আইনস্টাইন ভ্রান্ত!

the image

আলোর চেয়ে দ্রুতগতির কণা আবিষ্কারে পাল্টে যাবে পৃথিবীর অনেক হিসাব-নিকাশ টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে ফিরে যাওয়া আর কল্প কাহিনী হয়ে থাকবে না আইনস্টাইন কি হেরে আলবার্ট আইনস্টাইল কি ভুল বলেছিলেন? এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে সর্বোচ্চ গতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা কি মিথ্যা প্রমাণিত হবে? তাহলে তো পাল্টে যাবে পৃথিবীর অনেক হিসাব-নিকাশ। হেরে যাবে পদার্থ বিজ্ঞানের সম্রাট। আইনস্টাইনের বিখ্যাত আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বত:সিদ্ধ আলোর বেগের চেয়ে দ্রুতগতিতে ভ্রমণ সম্ভব নয়। তার মানে হলো আলোর চেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন কণা মহাবিশ্বে আর নেই। কিন্তু সেই স্বত:সিদ্ধকে ভুল প্রমাণের দাবি করেছেন একদল বিজ্ঞানী। নিউট্রিনো নামে একটি কণাকে আলোর চেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন বলে দাবি করেছেন তারা। পদার্থ বিজ্ঞানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ল্যাবরেটরি গ্র্যান স্যাসোর বিজ্ঞানীরা ইটালির একটি পর্বতের নিচে পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন নিউট্রিনো আলোর চেয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫ হাজার ৯৯৬ মিটার বেশি বেগে চলে। প্রশ্ন হচ্ছে যদি তাই হয়, তাহলে অন্তত: তত্ত্বে হলেও সম্ভব হবে অতীতে পৌঁছে যাওয়া। টাইম ট্রাভেল ইনটু দ্য পাস্ট। নিজের শৈশবে ফেরত যাওয়ার যত টাইম মেশিন এক্ষণি তৈরি না হলেও তেমনি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে এই আবিষ্কার। তাইতো হাজারো জিজ্ঞাসা ও সম্ভাবনা নিয়ে তোলপাড় পাদার্থবিদ্যার জগত। সম্প্রতি ঘোষিত এই পরীক্ষার ফলাফলে টুইটার, ফেসবুক ও ব্লগ মন্তব্যে সয়লাব সারাবিশ্ব।

 

আইনস্টাইন বলেছিলেন, আলোর চেয়ে বেশি গতিতে আর কেউ ছোটে না এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে। শূন্যস্থানে আলো প্রতি সেকেন্ডে পাড়ি দেয় ২৯ কোটি ৯১ লাখ ৯২ হাজার ৪৫৮ মিটার। এর চেয়ে বেশি গতি পৃথিবীতে আর কারো নেই। আর এই দাবিই আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা সূত্রের ভিত। বস্তুত এই গতিসীমার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে গোটা পদার্থবিদ্যা অনেকখানি। কিন্তু একদল ইউরোপীয় বিজ্ঞানীর পরীক্ষার ফলাফলে জানা গেল অন্য কিছু। আইনস্টাইনের আলোর গতিতত্ত্ব সঠিক নয়। জেনেভার কাছে ভূগর্ভে গবেষণার সার্ন থেকে কাতারে কাতারে ছোড়া হয়েছিল বিশেষ জাতের কণা নিউট্রিনো। মাটি কুঁড়ে সে কণা গিয়ে পৌঁছায় ৭৩০ কিলোমিটার দূরে ইটালির গ্র্যান সাসো পাহাড়ের অন্য এক গবেষণাগারে। এতে দেখা গেছে, নিউট্রিনো ছুটেছে সেকেন্ডে ৩০ কোটি ৬ হাজার মিটার বেগে। ঐ একই পথ পাড়ি দিতে আলোর লাগত ১ সেকেন্ডের ১০ হাজার ভাগের ২৩ ভাগ সময়। কিন্তু নিউট্রিনো কণাদের লেগেছে এক সেকেন্ডের ১০ কোটি ভাগের ৬ ভাগের কম সময়। অর্থাত্ নিউট্রিনো ছুটতে পারে আইনস্টানের কল্পিত গতিসীমা ছাড়িয়ে আরো দ্রুতগতিতে। তবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফলে অবশ্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভড়তে গিয়েছিলেন। প্রায় বুঝতে পারছিলেন না এই ফলাফল কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এখন এই অভিনব আবিষ্কারটির স্বীকৃতির জন্য বিশ্বের অন্য ল্যাবরেটরির পর্যালোচনার ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে যাইহোক এই আবিষ্কার যদি শেষ পর্যন্ত নির্ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার স্বত:সিদ্ধ অনুযায়ী অনেক অসম্ভব হয়ত সম্ভব হয়ে যাবে। হয়ত মানুষ এবার তার অতীতেও তথ্য পাঠাতে সক্ষম হবে, পদার্থ বিজ্ঞান না কখনোই সমর্থন করেনি। এর ফলে অতীত আর বর্তমানের মধ্যেকার এতোদিনের বিভেদ-প্রাচীর থাকবে না। এতে কার্যকারণের মৌলিক নীতিরই পরিবর্তন ঘটবে। তবে সন্দেহ তো সন্দেহই যদিও বিশেষ আপেক্ষিকতা ভুল প্রমাণিত হলে পদার্থবিদ্যাই অনেকটা উল্টে-পাল্টে যাবে। তাই বিজ্ঞানী মহলে এখনই গুঞ্জন উঠেছে এরপর আসলে কি হবে। নিউট্রিনোর দৌড় পরীক্ষা করেছিলেন যে সব বিজ্ঞানী তাদের মুখপাত্র বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্তোনিও এরিদিতাতো বলেন, ফলাফল দেখে আমরা স্তম্ভিত। আমরা পরীক্ষা করেছি বহু মাস ধরে, খতিয়ে দেখছি নানা দিক- নানা ভাবে। এমন কোন যান্ত্রিকত্রুটিও শনাক্ত করতে পারিনি, যা বদলে দিতে পারে পরীক্ষার আশ্চর্য এই ফলাফল। আমরা তো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাবোই সেই সঙ্গে তাকিয়ে থাকবো অন্যান্য দলের নিরপেক্ষ পরীক্ষার দিকে। জানতে চাইব আমাদের পর্যবেক্ষণ ঠিক কিনা।

নিউট্রিনো পরীক্ষার অবিশ্বাস্য এই ফলাফল নিয়ে বিখ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনও মন্তব্য করার সময় আসেনি। আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার। আরেক ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞান ও রয়েল সোসাইটির প্রাক্তন সভাপতি স্যার মার্টিন রিচ বলেন, অত্যাশ্চর্য দাবির স্বপক্ষে অত্যাশ্চর্য প্রমাণ প্রয়োজন। তবে এটুকু বলতে পারি, এই দাবিটি অত্যাশ্চর্য। সার্নের গবেষণাকারী বিজ্ঞানী দলের নেতা সার্জিও বার্তোলুচি বলেছেন, যখন কোন পরীক্ষায় আপাত-অবিশ্বাস্য ফলাফল বেরিয়ে আসে এবং যার পেছনে কোন যান্ত্রিক বা মাপজোখের ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন সাধারণ নিয়মেই ফলাফল পেশ করা হয় ব্যাপকতর যাচাইয়ের জন্য। গবেষণকরা তাই করেছেন। এটা চমত্কার এক বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ। ফলাফল যদি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় তাহলে হয়ত পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে। কিন্তু তার আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, গবেষকদের পরীক্ষায় কোন ত্রুটি ছিল না, অথবা আর কোনভাবে নিউট্রিনোর অবিশ্বাস্য গতির ব্যাখ্যা করা যায় না। বার্তোলুচির মন্তব্যে সায় দিয়ে এরিদিবাতো বলেন, আমাদের পরীক্ষার ফলাফল এতই বড় যে এক্ষুণি কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। আমার প্রতিক্রিয়া এরকম, নিউট্রিনো এখনো রহস্যের ডালি সাজিয়ে আমাদের বিস্মিত করছে। নিউট্রিনো সত্যিই এক রহস্যময় কণা। প্রতিটি মুহূর্তে লক্ষ কোটি এই কণা ভেদ করে যাচ্ছে যে কোন মানুষের দেহে। বাড়ি-ঘর,গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত এমনকি গোটা পৃথিবী ভেদ করে অবাধে তারা ছুটে যাচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ছুটে যাচ্ছে কোন প্রতিক্রিয়া ছাড়াই। ছুটতে ছুটতেই এক জাতের নিউট্রেনো রূপ বদল করে পরিণত হয়ে অন্য জাতের নিউট্রিনোতে। ওরা বাস্তবে থাকলেও উপস্থিতি শনাক্ত করা দুরূহ কাজ। এজন্য নিউট্রিনোকে ভূতুড়ে কণাও বলা হয়। আর এই ভূতুড়ে কণার পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভিন্ন দেশ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ভারতীয় গবেষক দলের মুখপাত্র এবং টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসাটের অধ্যাপক নবকুমার মন্ডল রীতিমতো বিস্মিত ইউরোপীয় গবেষকদের পরীক্ষার ফলাফলে। তিনি বলেন, নিউট্রিনোর আস্তিনে যে আর কত যাদু লুকিয়ে আছে, তা ভেবে মজা পাচ্ছি। পরীক্ষার ফলাফল অভাবণীয়। তবে তা চূড়ান্ত সত্যি কিনা, তা বলার সময় এখনো আসেনি। এ রকম পরীক্ষা আরো দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মিল্যাব গবেষণাগার থেকেও ৭৩৫ কিলোমিটার দূরে মিনেসোটা প্রদেশের সুদান খনিতে নিউট্রিনো ছোড়া হচ্ছে। ওই কণাও আলোর চেয়ে বেশি গতিতে দৌড়াচ্ছে কিনা তা জানা দরকার। নিউট্রিনো নিয়ে গবেষকদের আরেকজন দাবিও আউতিয়েরো বলেছেন, সার্ন এবং গ্র্যান সাসোর মধ্যে সময় মাপার ক্ষেত্রে আমরা ন্যানো সেকেন্ড পর্যায়ে নিখুঁত ছিলাম। আর দু’টো জায়গার মধ্যে দূরত্ব মাপার ক্ষেত্রে মাত্র ২০ সে.মিটার এদিক-ওদিক হতে পারে। তাই যান্ত্রিক পর্যায়ে ত্রুটির সুযোগ সামান্য। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে আমাদের ফলাফল খুবই উঁচু মানের। আমরা তা পেশ করছি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। এজন্যই আমরা অন্যদের সঙ্গে আমাদের ফলাফল মিলিয়ে দেখতে চাই। ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের কণা পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক জেফ ফোর্সের মতে, তিনিও তাকিয়ে থাকবেন অন্য পরীক্ষার দিকে এর তাত্পর্যের কথা ভেবেই। তিনি বলেন, আলোর বেগ শুধু পৃথিবীতে গতির ঊর্ধ্বসীমাই নয়, এর মধ্যে বাঁধা আছে কার্যকারণ সম্পর্কও। এজন্য কারণ না থাকলে কার্য হয় না।

 

আলো যদি সর্বোচ্চ গতিশীল না হয়, তাহলে ভেঙে যাবে এই সম্পর্ক। কোর্সের কথায়, নিউট্রিনো যদি সতি-সত্যিই আলোর চেয়ে বেশি গতিতে দৌড়ায় তাহলে আজকের তথ্য পাঠিয়ে দেয়া যাবে গতকাল অর্থাত্ অতীতে। অন্যভাবে বললে বলা যায়। এতদিন টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে ফিরে যাওয়ার যে কল্প কাহিনী আমরা বলে আসছি, মনে হয় আমরা অনেকটাই তার কাছাকাছি। যদিও তার মানে এই নয় যে, আমরা খুব শিগগিই বানিয়ে ফেলতে পারবো অতীত যাত্রার টাইম মেশিন। কিন্তু সেই সফলতার মধ্যে দিয়ে শুরু হতে পারে আমাদের সেই পথে অভিযাত্রা।

(লেখাটি আজকের ইত্তেফাক পত্রিকা থেকে সংগৃহিত। এখানে শুধু কপি করে পেস্ট করা হল। মূল লেখক আশরাফুল ইসলাম লিখেছেন আজকের ইত্তেফাকে)

By সাইফ দি বস ৭

পুরো নাম সাইফ হাসান। ছোটকাল থেকেই প্রযুক্তি, কম্পিউটার সম্পর্কিত বিষয়ে প্রচুর আগ্রহ এবং কৌতূহল। বর্তমানে কর্মরত আছেন উইডেভসের প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে। হিউম্যান সেন্টার্ড ডিজাইন, প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট এবং এজাইল প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টেই ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করেন।

মন্তব্য করুন